ডেমোক্রেসি – অধীশা সরকার

স্বর মুক্ত হোক: স্বর যুক্ত হোক—/

বিষয়টা হল, এনসিআরটি’র সিলেবাস থেকে ‘ডেমোক্রেসি’ বিষয়ক চ্যাপ্টারটি কেটে বাদ দেওয়া হচ্ছে। বুঝলেন? এমতাবস্থায় বিষয়টা আর বিজেপি ভার্সেস কংগ্রেসের জায়গায় নেই, কেমন? বিজেপি বা কংগ্রেস, যেই ক্ষমতায় আসুক, ‘ডেমোক্রেসি’ জিনিসটা ‘মার্কেট’ আর চাইছে না। উল্টোদিকের মুশকিলটা হল, সুষ্ঠুভাবে ডিক্টেটরশিপ প্রতিষ্ঠা করার মত একজন ডিক্টেটরও ভারতবর্ষে জন্মায় নাই। অতঃকিম?

কিছুই না। রিল্যাক্স করুন। চাপের কিছু নেই। প্রথমে গরীবগুর্বোরা একে অপরকে পিটিয়ে মারবে। আপনার ড্রয়িং রুম পর্য্যন্ত বিষয়টা পৌছতে দেরী আছে। তদ্দিন আপনার ছেলেপুলে স্কুলে ‘ডেমোক্রেসি’ বিষয়টা শিখবে না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ডেমোক্রেসিকে খিস্তোতে শিখবে। আর… ও হ্যাঁ। দেশটা অম্বানিই চালাচ্ছে, ক্ষমতায় যেই আসুক। এ নিয়ে কোনো ইল্যুশন না থাকাই ভালো৷

আপনার কী করনীয়? আজ্ঞে, বিশেষ কিছু না। মানে নিতান্ত গাম্বাট বা ফুটেজখোর হলে আপনি অবশ্যই ‘বিপ্লব’ করবেন। সে তো আর আমার কথার অপেক্ষায় বসে থাকতেন না, যে আমায় বলে দিতে হবে। সেসব করুন। নিতান্ত সুস্থ মানুষ হলে ঘুমিয়ে পড়বেন। আর নিতান্তই আবোদা ‘দেশপ্রেমী’ হলে শুধু একটাই কথা মনে রাখার চেষ্টা করুন। পাকিস্তানকে একশোবার খিস্তি করবেন। অবশ্যই করবেন৷ কিন্তু খিস্তোনোর সময়ে নিজের দেশকে তার চেয়ে মর‍্যালি সুপিরিয়র কিছু না ভাবাই বোধয় ভালো। আপনার আর ওদের মধ্যে এই মূহুর্তে তফাৎ একটাই। ওরা অনেকদিন হল পৌছে গেছে। আর আপনি অনেক পরে হাঁটতে শুরু করেছেন বলে রাস্তায় আছেন।

অক্ষর: Adheesha Sarkar

Advertisements

ক্লাস এইট- সংকলন সরকার

ক্লাস এইটে সাইটোপ্লাজম, নিউক্লিয়াস, ক্লোরোফিল, ফোটোসিন্থেসিস, প্রোটিন ভিটামিন, ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র জননতন্ত্র, পানিপথ খানুয়া পলাশীর যুদ্ধ, আকবরের শাসন, তুঘলকের তুঘলকি, শের শার জিটি রোড, পাস্কাল, নিউটন, আরকিমিদিস আর এ প্লাস বি হোলস্কয়ারের সুত্র, সুদকষা, ত্রৈরাশিক, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, ঐকিক নিয়ম, বাঁদরের তেল মাখা বাঁশ, চৌবাচ্চার ফুটো, পামির মালভূমি, এভারেস্টের উচ্চতা, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা, চাঁদের ডিসট্যান্স, গতি জাড্য, ডেনসিটি ইকোয়াল্টু মাস বাই ভলিউম, নেপচুনের আবর্তন কাল, আলোর গতি, মরুভূমি, মরীচিকা, সালফিউরিক অ্যাসিড, সোরা, গন্ধক, নিশাদল, টেনস, থার্ডপার্সন প্লুরাল নাম্বার, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিভূতি বাবুদ্বয় সহ আরো অনেক অনেক কিছুই জানা হয়ে গেছিলো… এখন শুধু ওই সুদকষা আর ঐকিক নিয়মটাই যা একটু কাজে লাগে… এছাড়া বাজারহাটে সর্বক্ষণ কাজে লাগে প্রাইমারী ইস্কুলের যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ, ব্যাস! ভাবা যায়??? মাত্র ক্লাস এইট অবধিই এতোকিছু গিলেছি! এর পরের উচ্চশিক্ষা দিয়ে কি আর করব বলো?! ওসব আমার কোনো কাজে লাগেনি। সমঝদারোঁ কে লিয়ে ইশারা হি কাফি… শোনো, স্কুলে একবার মান্নাবাবুর হাতে একটা বিরাশীসিক্কার থাবড়া খেয়েছিলাম, মান্নাবাবু তখন ক্লাসে ইনার্শিয়া বোঝাচ্ছিলেন। দশাসই চেহারা আর তেমনি তার হাতের পাঞ্জার সাইজ… সেই জন্যেই ও থাপ্পড়কে থাপ্পড় না বলে থাবড়া বললাম! যাইহোক সেই মাস ইন্টু ভেলোসিটির থাবড়া যখন গালে এসে থামল, এক থাবড়ায় সারা জীবনের মতন বুঝেগেলাম গতিজাড্য আর স্থিতিজাড্য কারে কয়, মাস আর ভেলোসিটি কা চিজ, সঙ্গে মান্নাবাবুর থাবড়ার ব্রেক হর্সপাওয়ার কত সেও এক নিমেষে টের পেয়ে গেলাম।

সেই জন্যেই তখন তোমায় বিড়বিড় করে বলছিলাম… হে দেবী সরস্বতী, শুধু অল্প একটু বুদ্ধি দিয়ো, তাইলেই হবে…! যথেষ্ট বিদ্যে অর্জন হয়েছে সেই কোনকালে এক বাংলা ইশকুলে একটু বাংলা ইংরিজি, একটু অঙ্ক বিজ্ঞান, একটু ইতিহাস ভুগোল আর একটু পাড়ার লাইব্রেরীতে গিয়ে খামচাখামচি করে গাদাগুচ্ছের হাবিজাবি পড়েছিলাম… ব্যাস তাই দিয়েই ইহজীবন উতরে গেছে। যা যা কাজ করে বেড়াই তাতে প্রতিনিয়ত শুধু ক্লাস ফোর অবধি প্রাথমিক পড়াশোনাটুকুই বড্ড কাজে লাগে, ম্যানেজমেন্ট বা কারিগরি ফলানোর জন্য ক্লাস এইট অবধি যা যা ইনপুট আর স্কুল জীবনে যত বন্ধুত্ব অ্যাডভেঞ্চার ঝগড়া মারামারি খেলাধুলো করেছি সে সমস্ত অভিজ্ঞতা আমার ম্যানেজমেন্ট সামলানোর পক্ষে মোর দ্যান এনাফ… মাকালীর দিব্বি গেলে সব সত্যি বলেছি হে দেবী সরস্বতী… আমায় শুধু টাইম মতন একটু বুদ্ধি আর জিভের ডগায় একটু কথা সাপ্লাই দিয়ো… বিদ্যা ফিদ্যা আর দরকার নেই রে দিদি… আমার ভাগের এক্সেস বিদ্যাটুকুন তোমার স্টকে বিলিয়ে দিলুম… ওইটে বরং যারা আকুল হয়ে চাইছে তাদের সবাইকে ঠিকমতন বিলিবাটা করে দিয়ো দিদিভাই। যাকগে শোনো, তোমার সাথে পরে আবার কথা হবে। এখন রাখছি। কয়েকটা যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের কাজ বাকি আছে… সেগুলো সেরে নিই… টা টা।

Honor, trust, loyalty – Soumadeep Mazumdar

You know, whatever happened to things like “honor”, “trust”, “loyalty”, having some ideals in life and living by it. I guess you could say that I am quoting from a time of nobles and knights on horseback, but, even in this dark cold world, sometimes all we need a little of that shining armor and less of kill your parents, fuck your friends and have a nice day.

Fan Theory: Soumadeep Mazumdar

Fan theory about fan theories – when the creators originally create something which provokes fan theories and speculations, they actually have no idea of what they’re doing. But, when fans come with elaborate plots and theories which gradually could spin off tons of sequels and discussions and free publicity, the creators just run with the theory and confirm it in the next episode or season or sequel. Just as an pastiche or homage to the fans and sometimes maybe even to embark on a money train agenda. Right?

Also, you think I should post things on Reddit. Maybe I should post things on Reddit. I’ll post things on Reddit. Facebook crowd too stupid anyway.

Sunday Nights: Soumodeep Majumdar

There’s a certain reticence that lingers around in late on Sunday nights. The omnipresent idea of having to face another week scorching among the masses of inane vanity and lackluster attempts at being “somebody” in a world full of nobody’s.

The overtly optimistic pest grinding on about how much they love their jobs on Monday’s, the tiring Instagram and Facebook model priding about how much work they put into “that”, the incessant food-blogger claiming like none of us have ever had noodles, the flustering party hog who is so confident about their weekend being sorted among a flurry of weirdly shaped drinks, the tireless couples desperately trying to capture and reminisce their one chance of happiness – all the while you’re trying to look away, not care, not let the image of these totally functional, immaculate people get the best of you by drowning yourself in mediocrity and alcohol. Truly a magnificent generation we belong in.

ধর্ম- সুপ্রীতি মাইতি

পূজো করলেই কেউ ধর্মান্ধ হয় না। নামাজ পড়লেই কেউ ধর্মান্ধ হয় না। চার্চে গিয়ে প্রার্থনা করলেই কেউ ধর্মান্ধ হয় না।

ধার্মিক আর ধর্মান্ধ দুটি পৃথক তত্ত্ব।

কে ধার্মিক হবেন আর কেইবা ধর্মান্ধ হবেন, তা এই পূজো করা, নামাজ পড়া চার্চে যাওয়া টাওয়ার ওপর আদৌ নির্ভর করে না। কোনও ধর্মীয় স্থানে, তীর্থে, উপাসনালয়ে কোনওকালে একবারও না গিয়ে কেউ ধার্মিক হতেই পারেন, আবার কোনও ধর্মস্থানে কোনওকালে একবারের জন্য না গিয়েও কেউ ধর্মোন্মাদ হতে পারেন।

ধর্ম কি? একটি বিশ্বাসের একটি তত্ত্বের কাছে নিজেকে, নিজের চেতনাকে, বিচারবুদ্ধিকে নিঃশর্তে, পরিপূর্ণভাবে, প্রশ্নহীনচিত্তে সমর্পণ করাকেই ধর্ম বোঝায়।
আর এই প্রশ্নহীন আনুগত্য কেবল তথাকথিত প্রচলিত ধর্মগুলির ক্ষেত্রেই যে হয়, তা মোটেও নয়। ধর্ম হিসেবে ধরিই না এমন অনেক তত্ত্বকেই আমরা ধর্মের মতোই প্রশ্নহীনভাবে নিঃশর্তে বিশ্বাস করি, মেনে নিই। যেমন, গান্ধীবাদ, যেমন মনুবাদ, যেমন মার্ক্সবাদ, যেমন নকশালবাদ, যেমন ব্রাহ্মণ্যবাদ, যেমন তথাকথিত নারীবাদ।

এইসকল তত্ত্ব জেনে বা না জেনে, শুধুমাত্র বিশ্বাসের বশে মেনে নেওয়ায় যাঁরা অন্তরে শান্তি পান, তত্ত্বগত কিছু বিচার বা অনুসরণযোগ্য কিছু যাপনশৈলী নিজ নিজ জীবনচর্যায় সামিল করে যাঁরা আশ্বস্ত হন, অথচ খুব রূঢ়ভাবে চাননা যে অপরাপরজনেও ঐ মতটি কঠোরভাবে অনুসরণ করে চলুক- তাঁরা একরকম ধার্মিক বলা চলে।

যিনি নাস্তিক তিনিও ধার্মিক হতে পারেন। যিনি অবিশ্বাসী, তিনিও ধার্মিক হতে পারেন। নিজের তত্ত্বে বিশ্বাসী নমনীয় চিন্তাধারার মানুষ মাত্রেই ধার্মিক। নাস্তিকতা, অথবা যুক্তিবাদভিত্তিক অবিশ্বাসও এক একটি তত্ত্বই।

ধর্মান্ধ ব্যক্তিমাত্রই অনমনীয়, গোঁয়ার। নিজের বিশ্বাসটিকে পাশাপাশি সকলের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে চারিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত স্বস্তি পান না এঁরা। এঁরা নিজ বিশ্বাসে অবিচল এবং মনে করেন সকলেরই উচিৎ তাঁর মতেই বিশ্বাসী হওয়া। ভিন্নমত, তত্ত্ব, বিরুদ্ধমত সবকিছুকেই বিষবৎ অপছন্দ করেন এঁরা।

উগ্র হিন্দুত্বের তত্ত্বটি ইদানীং খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষত গোবলয়ের কঠোর ঘৃণ্য জাতিবাদ, অতীব অবমাননাকর অপমানজনক লিঙ্গবৈষম্য, পরধর্মবিদ্বেষ আজ স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও মানুষের মনে জাঁকিয়ে বসে আছে। তাতে ধুঁয়ো দিচ্ছে আখের গুছোনো প্রবল স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ। সুগভীর জাতিভেদকে প্রশ্রয় দিয়ে সমাজে বিভেদ অসাম্য জিইয়ে রেখে ক্ষমতা দখলের প্রাচীন খেলা ভারতীয় গণতন্ত্রের একটি মূল বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে তথাকথিক ‘সাম্প্রদায়িক’ এবং তথাকথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ দলগুলির ভূমিকা কার্যক্ষেত্রে একই। কিছু ক্ষেত্রে অযৌক্তিক এবং অবমাননাকর সংরক্ষণ নীতি এই বিভেদকে আরও প্রকট করে তুলেছে, ভবিষ্যতেও তুলবে। হিংস্রতায় এঁরা পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মান্ধের তুলনায় কোনও অংশে কম যান না।

লাগামছাড়া দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের কারণে ভারতে দারিদ্র্য লাগাতার বেড়েই চলেছে। কর্তাভজা আমলাদের তৈরি করা পরিসংখ্যানের কোনও মূল্যই নেই এক্ষেত্রে। দিন যত এগিয়েছে, সমাজে আর্থিক শ্রেণীভেদ ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে, এক শ্রেণীর মানুষের সামনে আর্থিক সুযোগ ও স্বাধীনতা কমতে কমতে প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। সেই সীমাহীন দারিদ্র্য ও অসহায়তাকে পুঁজি করে আর এক তত্ত্বের কারবারিরা দরিদ্র মানুষগুলিকে তাদের সহজ নিশানা বানাতে চেয়েছে। এরা নকশালবাদী এবং মাওবাদী। উগ্র ধর্মান্ধদের সাথে গোঁড়ামিতে এবং হিংসায় কোনওভাবেই এদের তফাত করা যায় না।

বর্তমান সামাজিক গঠনতন্ত্রে উচ্চশ্রেণীভুক্ত, তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ গোষ্ঠীর হাতে সমস্ত সামাজিক আর্থিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সঙ্গত কারণেই এঁরা প্রভাবশালী, স্বাধীন এবং যেনতেনপ্রকারেণ নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। ‘প্রগতিশীলতা’ এঁদের একটি ভেক বৈ আর কিছু নয়। সামাজিক ন্যায় ও সমাজের সকলের সমঅধিকারের দাবী, তথাকথিত ‘এ্যক্টিভিজম’ এঁদের মুখোশ এবং অবসরের খেয়াল মাত্র। নিজেদের গ্রহণযোগ্যতাটুকু বজায় রাখতে এসব একটু করতেই হয়। সবই আসলে কথার কথা, কার্যক্ষেত্রে এঁরা ধর্মান্ধদের মতই হিংস্র ও ভিন্নমত অসহিষ্ণু।

যেকোনও সরকারি কিমবা বেসরকারি ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য, জাতিবিদ্বেষ, ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রত্যক্ষ কিমবা পরোক্ষভাবে বিদ্যমান। কোথাও বেশি কোথাও কম।
জনপ্রিয় বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সাম্প্রতিককালে এবং অতীতেও মারাত্মক লিঙ্গবৈষম্যের ঘটনা সামনে এসেছে এবং ঘটনাক্রম অনুসরণ করলে বোঝা যায়, লিঙ্গবৈষম্য এবং মধ্যযুগীয় ধ্যানধারনার মূল কত গভীরে তার শিকড় চারিয়েছে।
কোনও অভিনেত্রী শ্লীলতাহানি বা সমগোত্রীয় হয়রানির অভিযোগ আনলে প্রথমেই তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়ে থাকে। তাঁকে মিথ্যবাদী বানানো হয়, জনগণের কাছে যেনতেনপ্রকারেণ হেয় প্রতিপন্ন করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলে। চূড়ান্ত পুরুষতান্ত্রিকতার নগ্ন উদাহরণ হল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। কেউ প্রতিবাদ করে না। প্রায় ঈশ্বরের সমতূল্য মর্যাদাপ্রাপ্ত তথাকথিত মেগাস্টারেরা হয় নীরব থাকেন নয়তো প্রভাবশালী অভিযুক্তের সমর্থনে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ান।
সেই অভিযুক্তকে ‘হিরো’ বানিয়ে তাঁর ‘বায়োপিক’ও তৈরি হতে পারে, তা ‘সুপারহিট’ও হতে পারে।

প্রায় একই ছবি রাজনীতির জগতে, কর্পোরেট দুনিয়ায়, খেলাধুলার জগতেও দেখা যায়। এই প্রতিটি ক্ষেত্রের সাথে তথাকথিত ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’র সুস্পষ্ট যোগাযোগ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে, বস্তুত সেই কালাদুনিয়ার অঙ্গুলিহেলনেই এইসকল নাট্যমঞ্চের পর্দা ওঠে বা পড়ে। লক্ষ্য মূলত জনগণের সমর্থন, তাই নানা ভেক তৈরি করে মানুষকে টুপি পরানো হয়ে থাকে। জনগণের দুর্বল স্মৃতি ও ধীশক্তিতে এঁদের অখণ্ড বিশ্বাস। জনমত স্বভাবতই জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়িত হতে থাকে। অন্ধ অনুরাগ কেবলই তথাকথিত ধর্মসঞ্জাত হবে, এমন তো নয়!

এদেশে পশুখাদ্যে ভাগ বসানো লালুপ্রসাদকে দরিদ্র জনগণের ‘মসীহা’ বানানো হয়, কেবল বিদেশী গাড়িতে সফরকারী অথচ ‘স্বদেশী’ দ্রব্য বিক্রি করে বড় বড় শিল্পপতিদের পেছনে ফেলে দেওয়া বাবা রামদেব ‘সাধু’র মর্যাদা পান, ঘন্টায় ঘন্টায় পোষাক বদলানো নরেন্দ্র মোদিজি সর্বত্যাগী ব্রহ্মচারীর সম্মান পান, নগ্ন পরিবারতন্ত্রের নিকৃষ্টতম উদাহরণ প্রৌঢ় রাহুল গান্ধি নিজেকে ভারতের বিপুল যুবগোষ্ঠীর একমাত্র ভবিষ্যত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, কেউ প্রতিবাদ করে না। কারণ এঁদের বিশ্বাস করার লোকের অভাব নেই এদেশে। এই সম্মিলিত অন্ধত্বকে পুঁজি করেই এঁরা টিকে আছেন, যেমন তথাকথিত ধর্মগুলিও টিকে আছে। এই অন্ধত্ব থেকে মুক্তি ঘটবে তার আশু কোনও লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
অন্ধ বানানোর ব্যবসাগুলি টিকিয়ে রাখতে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীগুলি সকলেই একত্রিত এবং বদ্ধপরিকর। উচ্চবর্গের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই মূল লক্ষ্য। জনগণ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই আছে এবং নিজেদের মধ্যে মারামারি জিইয়ে রেখে ভবিষ্যতেও থাকবে।

★গণশত্রু ★

সত্যজিৎ রায়ের গণশত্রুর ডাক্তার গুপ্তকে মনে আছে?

যিনি ডাইরিয়া রোগের উৎস খুঁজতে গিয়ে ভুবনপল্লীর মন্দিরের চরণামৃতে খুঁজে পেয়েছিলেন রোগের জীবাণু।

রোগের কারণ নির্মূল করতে গিয়ে তাঁকে পড়তে হয়েছিল হুমকির মুখে। তিনি মাথা নত করেন নি। শেষ পর্যন্ত সফলতা তিনি পাননি। উল্টে মিলেছিল গণশত্রুর আখ্যা।

ঠিকই তো। একজন ডাক্তার কেন রোগের উৎস নিয়ে মাথা ঘামাবেন? তাঁর কাজ চিকিৎসা করা। তিনি সে সব শিকেয় তুলে প্রশ্ন তুলতে লাগলেন, কেন প্রতিবছর ডেঙ্গু প্রায় মহামারীর আকার নেবে? কেন বর্ষার সময় প্রতিদিন গড়ে ২০ জন ডাইরিয়ার রোগী একটা ছোটো হাসপাতালে ভর্তি হবে? কেন? কেন আর কেন…?

সরকারি ডাক্তারদের এসব প্রশ্ন তোলা একেবারে নিষিদ্ধ। জনগনের পয়সায় স্কুলে পড়েছি। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হয়েছি। জনগনের পয়সায় মাসে হাজার পঞ্চাশেক টাকা মাইনে পাচ্ছি। প্রশ্ন ট্রশ্ন করে সময় নষ্ট করলে হবে?

বরঞ্চ ঘাড় গুঁজে রোগী দেখে যাও। কলেরা, হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, ডিসেন্ট্রি… জলের পাইপলাইনে কোথায় ছ্যাঁদা হয়েছে সেটা নিয়ে ডাক্তার কেন মাথা ঘামাবে। মাথা ঘামাবার অনেক লোক আছে।

রাস্তার ধারে দেদার মদের দোকান। একশ মিটার অন্তর অন্তর। রাত দশটা বাজলেই বেপরোয়া বাইকের ঠেলায় প্রাণ হাতে করে যাতায়াত করতে হয়।

বাইকের উপর আঠারো কুড়ি বছরের ঐ যুবক গুলি কারা? আপনাদের কারো সন্তান নয়তো?

একজন ডাক্তারের এই নিয়ে প্রশ্ন তোলা নিষিদ্ধ। ছেলেটির এক্সিডেন্ট হলে তখন ডাক্তার বাবু সামলাবেন। মদ খেয়ে প্যানক্রিয়াটাইটিস হলে ডাক্তারবাবু চিকিৎসা করবেন। সফল হলে ভালো। আর না হলে, পেটাও ডাক্তার শালাকে। একটা জলজ্যান্ত ছেলে সামান্য পেটে ব্যাথা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালে ভর্তি হল। আর আমাদের ট্যাক্সের টাকায় টুকে পাস করা ডাক্তার ছেলেটাকে ভুল চিকিৎসা করে মেরে ফেলল।

ভুল চিকিৎসা কে বলল? কেন। আমরা কি সবাই অশিক্ষিত। গুগুল আছে। পেন অ্যাবডোমেনের চিকিৎসা জানা এমন কি কঠিন ব্যাপার। একটা প্যান্টোপ্রাজল ইংজেকশান আর একটা ড্রোটাভেরিন ইংজেকশান দিলেই ঠিক হয়ে যেত। ডাক্তার শালা অন্তত গুগুল দেখেও যদি চিকিৎসা করত, ছেলেটা বেঁচে যেত।

আর ডাক্তার গুপ্তের কি সাহস। তিনি মন্দিরের চরণামৃতকে দূষিত বলেছেন। মন্দির, দেব দেবী সম্বন্ধে কোনও ধারণা আছে ওনার?

কে যেন বহু আগে বলে গেছিলেন, “ধর্ম হোল আফিমের মত।” যে নেশায় ভুলিয়ে রাখা যায় গোটা দেশের অল্প শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত জনগনকে।

কথাটাযে কতটা সত্যি তা আমরা একবিংশ শতাব্দীতে পৌছে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। চারিদিকে শুধু পুজো আর পুজো। জন্মাষ্টমীর আগের রাতে ডিজে আর লোকনাথ বাবার ভক্তদের ঠেলায় রাস্তায় বেরোনোই মুশকিল। তারপর পাড়ায় পাড়ায় রাজনৈতিক উদ্যোগে গণেশ পুজো। আবার গণশত্রুর মত একটি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে। ইয়ে… রাজনৈতিক উদ্যোগে যদি প্রতি সপ্তাহে পাড়ার ড্রেন গুলি পরিষ্কার করা যেত, বয়স্কদের অক্ষর পরিচয়ের ব্যবস্থা করা যেত, স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্প করা যেত… তাহলে কি ভোটের গুণতিতে খুব একটা এদিক ওদিক হোত।

নিশ্চয়ই হত… ঐ যে বললাম না, ধর্মের আফিমের মত জোর আছে। না হলে চরম হিন্দুত্ববাদী নেতাও মাথায় ফেট্টি বেঁধে মসজিদে হাজির হন? না হলে সরকার কখনও দূর্গা পুজোর চাঁদা দেয়। তাও একশ দুশো নয়। একেবারে আঠাশ কোটি টাকা।

যাইহোক, এসব নিয়ে কথা বলার জন্য বুদ্ধিজীবীরা আছেন। ঐ যেনারা সন্ধ্যে বেলায় টিভিতে বিভিন্ন সিরিয়ালে সকলকে বুঁদ করে রাখেন। শুধু ধর্ম নয়। টিভি সিরিয়ালেরও আফিমের মত ক্ষমতা আছে। তাইতো একদিন সিরিয়াল বন্ধের উপক্রম হলেই নবান্ন মাথা ঘামায়। একদিনেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আর এক বছরে একশ ষাটজন চিকিৎসক বেধড়ক মার খেলেও কেউ মাথা ঘামায় না। একজনও গ্রেপ্তার হয়না।

কেন ঘামাবে? ডাক্তাররা কি বুদ্ধিজীবী? ডাক্তাররা কি ভোটব্যাঙ্ক?

ব্যাটাগুলো বড্ড হারামজাদা। কিছুতেই তালে তাল মেলাবে না। মারো শালাদের। বিশেষ করে মারো সেই সব প্রান্তিক ডাক্তারদের যারা পরিবার পরিজন ছেড়ে সভ্যতার সাথে সংযোগ হীন কোনও গ্রামে পরে থেকে পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন। না হলে শালাগুলোর জনসংযোগ আমাদের চেয়ে বেশী হয়ে যাবে।

কাল এগরা হাসপাতালে একজন ডাক্তারবাবু মার খেয়েছেন। একটি জলে ডুবে মৃত শিশুকে হাসপাতালে এনে তার পোস্টমর্টেম না করেই ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দেওয়ার দাবী ছিল। অত্যান্ত সামান্য একটি দাবী। সিনিয়ার ডাক্তার বাবু রাজি হননি। তাই তাঁকে জনা পনের লোক মিলে মাটিতে ফেলে গণধোলাই দিয়েছে। সেই ডাক্তারবাবু বলেছেন, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা ২০০ কিলোমিটার দূরে থাকেন। না, দোষীদের শাস্তি পাওয়ার মত স্বপ্ন তিনি দেখেন না। তাঁর একমাত্র চাওয়া তাঁর ছোট্ট মেয়েটা যেন বাবার মারধোর খাওয়ার খবর না পায়।

আমারও একই চাওয়া। আজ নয় কাল মার খাবই। আমার মেয়ে দুটো যেন সেই খবর জানতে না পারে।

এককোটি টাকা খরচ করে প্রাইভেটে যে কেউ ডাক্তারি পড়তে পারে। চিন্তানেই, নতুন নতুন অনেক প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ খুলছে। তারা নিশ্চয়ই আমাদের চাইতে ভাল পরিষেবা দেবে। কোনও প্রশ্ন না করে তারা ঘাড় গুঁজে রোগী দেখে যাবে। সে দিনের খুব বেশী দেরী নেই।

সেই কটা দিন ক্ষমা ঘেন্না করে আমাদের মেনে নিন। মাঝে মাঝে দু একটা বেয়াড়া প্রশ্ন করে ফেলতে পারি। মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায় যে জনগনের পয়সায় ডাক্তার হয়েছি। তখন আমাদের থামানোর জন্য পুলক দত্তের মত পুলিশ অফিসার আছে তো। যাদের ব্লাড প্রেশার একটু বেশীর দিকে।

সবশেষে ফেসবুকে প্রচুর লাইক আর শেয়ার পাওয়ার একটা সহজ উপায় বলি। একজন বানানো ডাক্তারের নাম দিয়ে মনগড়া একটি গাফিলতির খবর লিখুন। অন্তত হাজার খানেক লাইক, পাঁচশ শেয়ার। দেড় হাজার মন্তব্য, যার অধিকাংশই ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে কাঁচা খিস্তি করে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে একবার ট্রাই করে দেখুন।

সাধে কি বলি, ডাক্তারদের চেয়ে বড় গণশত্রু আর কেউ নেই।